দেশপ্রেম
পৃথিবীর সব দেশের মানুষের কাছেই দেশপ্রেম একটি বড় বিষয়। যে নিজের দেশকে ভালবাসে না, সে বেঈমানের চেয়েও নিকৃষ্ট জীব। সাধারণভাবে দেশপ্রেম বলতে আমি বুঝি যে দেশে আমি জন্মেছি, যে ভূখন্ডের উপর বড় হয়েছি, তার প্রতি টান, মমতা ও ভালবাসা। ভালবাসার প্রতিদান দিতে হয়। দেশপ্রেমের ক্ষেত্রেও আমি আপন দেশের জন্য কতটুকু কি করতে পেরেছি তা বিবেচ্য। আমি আমার নিজের দেশকে যেমন ভালবাসি, অন্যদের মধ্যেও সেই ভালবাসা কতটুকু আছে তা দিয়ে তাদের বিচার করি। যখন নিজের দেশের অপর কাউকে দেশ নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে দেখি, তখন বিরক্ত হই, প্রচন্ড রাগ লাগে। আবার এটাও হিসাব করি যে সে তার দেশকে ছোট প্রমানের চেষ্টায় এসব বলছে, নাকি দেশের টানেই দেশের নানান সমস্যা নিয়ে আবেগে আক্ষেপ করছে। একেক মানুষ একেক রকম। সবাইকে এক পাল্লায় ফেলে হিসাব করা যায় না। আর এই হিসাবটা শুধু নিজের দেশের লোকদের ক্ষেত্রেই না, ভিনদেশীদের উপরেও সমানভাবেই প্রয়োগ করি। আমার মতে যে যেই দেশে জন্মেছে সেই দেশের প্রতি তার টান থাকা আবশ্যক। একজন আমেরিকান, স্পেনিশ, ব্রিটিশ কিংবা ফরাসীর যার যার দেশের প্রতি টান থাকা উচিত। তবে এই টান বা ভালবাসা থাকার মানে এই না যে দেশের ভাল খারাপ সব কিছুকেই অন্ধভাবে সমর্থন দিয়ে যাওয়া। একজন দেশপ্রেমিক অবশ্যই তার দেশের বিভিন্ন সমস্যা নিয়া সোচ্চার হবে, এবং দেশের প্রতি ভালবাসা থেকেই দেশের দোষ-ত্রুটিগুলোকে শোধরাতে সচেষ্ট হবে। দেশের সরকার কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিতে গেলে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক অবশ্যই তার প্রতিবাদ করবে। এই প্রতিবাদ করার মানে এই না যে সে দেশদ্রোহী। এজন্যেই দেখি আমেরিকার মতো যুদ্ধবাজ দেশেও ইরাক যুদ্ধের প্রতিবাদে লাখ লাখ আমেরিকান রাস্তায় নেমে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়।
দেশবিদ্বেষ
এই যে নিজের দেশের প্রতি ভালবাসা, এই ভালবাসার বহিঃপ্রকাশে কেউ কেউ যে কাজটা করে থাকেন তা হলো অন্য দেশের প্রতি চূড়ান্ত বিদ্বেষ প্রকাশ করা। আমাদের দেশেই কেউ আছেন কট্টর ভারতবিদ্বেষী, কেউ পাকিস্তানবিদ্বেষী, আর অনেকেই আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি চরম বিদ্বেষমূলক মনোভাব নিয়ে চলেন। অনেকটা যেন অন্যান্য দেশের প্রতি যতো রূঢ় মনোভাব দেখাতে পারবো, ততোই নিজেকে আরও বেশি দেশপ্রেমিক প্রমান করা হবে। কিন্তু এটা ভুলে যাই যে সব দেশেই ভাল মন্দ মানুষ আছে। (এমনকি আমাদের নিজেদের দেশেও)। এবং হরেদরে কোন একটা দেশকে পুরো ভাল কিংবা পুরোপুরি মন্দ বলা যায় না। আমি নিজে ১৯৭১ এবং তার আগে থেকে বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তানের নানারকম অত্যাচার ও অপকর্মের জন্য পাকিস্তানের তৎকালীন সরকারের প্রতি তীব্র রাগ ও ঘৃণা অনুভব করি। তৎকালীন পাকিস্তানী সাধারণ নাগরিকদের বড় এক অংশও আমাদের গেঁয়ো চাষা হিসাবেই বিচার করতো। তাদের একপেশে আচরণের সাক্ষী আমার নিকটাত্মীয়ের মধ্যেই আছে। কিন্তু তার মানে এটা বলতে পারবো না যে পাকিস্তানী মানেই সবাই খারাপ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকে পড়া অনেক বাঙ্গালীকেই সেখানের পাকিস্তানী অধিবাসীরা নানাভাবে সাহায্য করেছে। তখনও অনেক পাকিস্তানী বাংলাদেশের এই হত্যাযজ্ঞের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলো। অনেকে আছে এখনও মাফ চায় তাদের সেসময়ের বর্বরতার জন্য। একইভাবে আমি আমেরিকার বর্তমান পররাষ্ট্র নীতি ও যুদ্ধনির্ভর পুঁজিবাদ অর্থনীতিকে অসমর্থন করি। কিন্তু তাই বলে সব আমেরিকানকে খারাপ বলতে পারি না। এখানেও এমন অনেকে আছে যারা দেশের সরকারের চেয়ে ভালমন্দের হিসাবটা আগে করে। ভারত যে আমাদের দেশের সাথে সম্পর্কে তার স্বার্থ আদায়ে ১০০ ভাগ সচেষ্ট, সেটা উপলব্ধি করলেও আবার অন্য দিক দিয়ে চাই আমাদের দেশের রাজনীতিবিদেরা যেন ভারতের রাজনীতি থেকে ভাল কিছু গ্রহণ করতে শিখে। অন্যান্য দেশের দোষ-ত্রুটির পাশাপাশি নিজের দেশের সমস্যাগুলোও চোখে পড়ে। ঘুষ-দুর্নীতি-রাজনীতি-সন্ত্রাস সব মিলিয়ে দেশের অবস্থা আগের চেয়েও অনেক অনেক বেশি নাজুক। আমাদের নিজেদেরই আমরা এমন অবস্থানে নিয়ে যেতে পারিনি যেখানে মাথা উঁচু করে অন্য দেশগুলোর দোষত্রুটি নিয়ে বড় গলায় কথা বলতে পারি।
অন্যদিকে আমাদের দেশে উলটো মনোভাবের লোকও যথেষ্ট আছে, যারা নিজের দেশ ও সংস্কৃতির প্রতিই তীব্র বিদ্বেষ প্রকাশ করে সুযোগ পেলেই। চোখ বন্ধ করে পশ্চিমা কৃষ্টি-কালচারের অন্ধ অনুকরণ করতে পেরেই নিজেকে "এবার স্মার্ট হয়েছি" ভেবে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে। অথচ পশ্চিমা কাপড়চোপড় পরিধান করে কথায় কথায় কিছু ইংলিশ বুলি ঝারায় মশগুল থাকলেও পশ্চিমা কালচারের সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্বশীলতা, নিজের কাজ নিজে করা এবং কথা দিয়ে কথা রাখার মতো ভাল অভ্যাসগুলো রপ্ত করায় তাদের কোন আগ্রহ থাকে না।
কিছু কথা
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে কিছু বলি। আমাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলায়। আমার বাবা-দাদার জন্ম সেখানেই। আমার মায়ের জন্মস্থান ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া। আর আমার জন্মের সময় আমার পরিবার চাকরীসূত্রে ছিলো রাঙ্গামাটি জেলায়। অর্থাৎ আমি জন্মেছি রাঙ্গামাটিতে। আমি বড় হয়েছি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। আবার বর্তমানে আমাদের পরিবার বাস করছে টঙ্গীতে, যেখানে আমার জীবনের বড় একটা সময় কাটিয়েছি। এখন এই ক'টা স্থানের মধ্যে আমাকে যদি শুধুমাত্র একটি জেলার প্রতি দেশপ্রেম (এখানে জেলাপ্রেম বলা যেতে পারে) প্রকাশ করতে বলা হয়, আমি কোনটিকে বেছে নেবো? আমি অবশ্যই আমার জন্মস্থান রাঙ্গামাটিকে অস্বীকার করতে পারি না। এর প্রতি আমার আলাদা টান থাকবেই। কিন্তু আমার রক্তের ধারার শিকড় আবার কিশোরগঞ্জ ও ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া জেলায়। নিজের শিকড়কেও অস্বীকার করার উপায় নেই। তাই এই দুই জিলার প্রতিও সুগভীর টান অনস্বীকার্য। এছাড়া যেসব জেলায় আমি বেড়ে উঠেছি, সেখানকার সুমধুর স্মৃতিগুলো এখনও মনে গেঁথে আছে। তাই সেসব জায়গার প্রতিও রয়েছে আলাদা এক ধরণের মমতা। তাই আমাকে যদি সব জেলা ফেলে শুধুমাত্র একটা জেলার প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করতে বলা হয়, সেটা কি আমার প্রতি অবিচার করা হবে না? এমন তো না যে এক জেলাকে ভালবাসলে অন্য কোন জেলাকে ভালবাসা যাবে না। আর অন্য সবগুলো জেলাকে বাদ দিলেও জন্মস্থান ও শিকড়, এই দুই জায়গার কোনটাকে বাদ দেয়া যাবে বলে আমি মনে করি না।
ভাগ্যিস জেলায় জেলায় ভাগ না করে আমাদের দেশপ্রেমের বিচার করা হয় পুরো দেশের হিসাবে। দেশের পরিসরে কিশোরগঞ্জ, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, রাঙ্গামাটি, সব মিলিয়ে এক দেশ। তাই আলাদা আলাদা জেলার হিসাব না করে সমগ্র বাংলাদেশের প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করলেই সব ক'টি জেলার প্রতি ভালবাসার প্রকাশ হয়ে যায়। আমার জন্য তাই ব্যপারটা সহজ হয়ে গেলো। কিন্তু কারও জন্য এই সীমাটা যদি দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে যায় তখন তার কি করা উচিত? উদাহরণস্বরূপ আবার নিজেকেই টেনে আনি। আমার জন্ম ও বেড়ে উঠা বাংলাদেশে। কিন্তু জীবিকার টানে বর্তমানে বাস করছি আমেরিকায়। এখানে যদি আমার কোন সন্তানের জন্ম হয়, তার জন্মস্থান হবে আমেরিকা, কিন্তু শিকড় বাংলাদেশের। তাকে কি আমি এই শিক্ষা দিবো যে "আমেরিকা খুব খারাপ দেশ, একে ঘৃণা করতে শিখো। তোমার আসল ঠিকানা বাংলাদেশ, তাই বড় হয়ে তোমাকে বাংলাদেশের জন্যে কিছু করতে হবে"? নাকি তাকে দুই দেশ, তথা সমগ্র পৃথিবীকেই ভালবাসতে শেখাবো? এটা শেখাবো যে জন্মস্থান এবং শিকড়, দুই দেশের প্রতিই তার দায়িত্ব আছে। দুই দেশের সমস্যা ও ত্রুটি নিয়েই তাকে সোচ্চার হতে হবে, চেষ্টা করতে হবে দেশগুলোকে আরও একটু ভাল অবস্থানে নিয়ে যাবার?
পরিশেষে
যেই পাতে ভাত খাই, সেই পাতে আমরা থুথু ফেলি না। যার নিমক খাই, তাকে পিছন থেকে লাত্থি দিলে সেটাকে নিমকহারামী বলে। জীবিকার তাগিদে বা যে কারণেই আমরা অনেকে বাংলাদেশের বাইরে থাকি, তাদের অনেকেই প্রচন্ডভাবে আপন দেশকে ভালবাসে। তাদের কষ্টের উপার্জন থেকে নিয়মিত দেশের আত্মীয়স্বজনের কাছে পাঠানো টাকা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। অথচ এই লোকগুলো বিদেশে না থেকে দেশে থাকলে হয়তো দেশের উন্নয়নে এমন ভূমিকা রাখতে পারতো না। অথচ যেই দেশে থেকে টাকা উপার্জন করে দেশে পাঠাতে পারছি, প্রকারান্তরে সেই দেশের প্রতিই যদি থুথু ফেলি, সেটাই বা ভাল হলো কিভাবে? আবার যদি নিজের দেশকে ভুলে বিদেশের প্রতিই অন্ধভক্তিতে গদগদ হয়ে থাকি, তাকেও নিশ্চয়ই ভাল বলা যাবে না। প্রত্যেককেই যার যার উপযুক্ত সম্মানটুকু ফেরত দিতে হবে।