মিয়ানমারের মতো সামরিক শাসিত স্বার্থলোলুপ সরকারের কাছ থেকে তেমন ভাল কিছু বিশ্বের কোন দেশই মনে হয় আশা করে না। তারা তাদের সুবিধামতো তাদের দেশের জনগণকে বঞ্চিত করবে, অত্যাচার লুটপাট করবে, এটাই যেন স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের মতো এক গণতান্ত্রিক দেশের তথাকথিত জনগণের সরকার কিভাবে আত্মসংকীর্ণতা থেকে মানবতাবোধকে উপরে তুলতে পারলো না?

যে দেশের জনগণ যেমন, তাদের নেতাও তেমন হবে, এই চিরসত্যটাই আবার প্রকট হয়ে চোখে পড়ছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়া নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকার ওয়েবসাইটে পাঠকের মন্তব্য, এবিষয়ক বিভিন্ন ব্লগ ও সেখানকার কমেন্ট পড়লেই ব্যপারটা আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। আমরা পুরো বাংলাদেশী জাতি হিসাবে অনেক বেশি স্বার্থপর ও সংকীর্ণমনা হয়ে উঠেছি, তো আমাদের সরকারই বা তার থেকে ভাল হতে যাবে কেন? রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের ক্ষেত্রে দেশের জনসংখ্যার সমস্যা থেকে নিয়ে আরও নানা রকমের বাহানা দিয়ে বিরোধীতা করছে অনেকেই। এমনিতেই আমাদের দেশ জনসংখ্যার ভারে কুজো হয়ে আছে, তার উপরে এসব রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীরাও এখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে, যেমন তাদের আরও অনেকেই এভাবে অনেকদিন যাবত আমাদের দেশে আছে, তারা খারাপ, তারা ড্রাগ ডীল করে, আমাদের দেশটা একটা ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত হবে তাদের আশ্রয় দিলে। এরকম আরও কতো টালবাহানা!

কিন্তু না! জনসংখ্যার জন্য আমাদের দেশটা ডুববে না। ডুববে এসব জনসংখ্যার ভিতরে মানবিকতাবোধ, নীতি, সহনশীলতা, পরোপকারিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এসব ভাল ভাল গুণাবলীগুলোর অভাবে। দিন দিন মানুষ থেকে আমরা সমষ্টিগতভাবে যখন নিচে নেমে যাচ্ছি, তখন আমাদের ধ্বংসের জন্য বাইরে থেকে কাউকে আমদানী করার দরকার কি? আজকে আমার স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমি প্রতিবেশীর বিপদে উপকার করবো না। কাল প্রতিবেশী আমার দরকারে উপকারে না আসলে তাকে ইচ্ছেমতো গালি দেবো। তার পরদিন নিজের স্বার্থ নিয়ে নিজের ভাইয়ের সাথেই খুনাখুনিতে লিপ্ত হবো। আসলে হবো না, ইতিমধ্যেই হচ্ছি। পত্রিকা খুললেই চোখে পড়ে আমাদের দেশের অবস্থা কোথায়। কথায় কথায় শিশু থেকে নিয়ে বৃদ্ধ অপহরণ, খুন, ডাকাতি এসব শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণেই হচ্ছে না। কয়েকটা টাকার থেকে আমাদের কাছে মানুষের জীবনের মূল্য এখন অনেক কমে গেছে। তাই সহজেই যে কেউ নিজের স্বার্থের চিন্তা করে এসব করতে পারছে। তিন বছরের প্রেমিকাকে খুন করে টুকরো টুকরো করে কেটে কিছু অংশ জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দেয়া, আর বাকী কিছু অংশ কমোডে ফ্ল্যাশ করার জন্য আমাদের রোহিঙ্গাদের আমদানী করতে হয়নি। আমরা বাংলাদেশীরাই এসব কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেছি। কথায় কথায় হরতালে যোগ দিয়ে দেশ ও জনগণের সম্পত্তি ভাংচুড় করার জন্যও মিয়ানমার বা ভারত থেকে আমাদের লোক আনতে হয় না। ভিন্নমতের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ কতটুকু, তা দেখার জন্য আমাদের দেশের দুই দলের নেতা-নেত্রীদের দিকে না তাকালেও চলবে, বাংলা ব্লগের সাইটগুলোতে একটু নজর রাখলেই টের পাওয়া যায়। টাকার জন্য ঘুষ খাওয়া, সেটাও এদেশে এখন একটা স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মানুষটা ভাল কিনা সেটা যাচাই করে আমরাই আর কাউকে সম্মান দিতে যাই না। সম্মান দেই লোকটা কোন গাড়িতে চড়ে, বাড়ি কতো বড় এসব দেখে। পূজো করি নীতির না, টাকার। তো এই আমাদের বিপদে ফেলার জন্য অন্য কাউকে কি দরকার?

জনসংখ্যার সমস্যা তো? ঠিক আছে, না আশ্রয় দিলেন রোহিঙ্গাদের। তারা বাঁচলে বাঁচুক, মরলে মরুক। সংকীর্ণ থেকে আরও সংকীর্ণ হতে থাকুন সবাই। আমি দেখতে চাই আপনাদের এ চিন্তাধারা দেশকে কোথায় নিয়ে যায়, আর আপনারাই বা এমন কি অর্জন করে ফেলেন এই মানসিকতা নিয়ে।

জনসংখ্যা কখনোই কোন দেশের জন্য সমস্যা ছিলো না। এক পরিবারে একজন দক্ষ লোকের জায়গায় দশজন দক্ষ লোক থাকলে তা পরিবারের ভিত্তিই আরও মজবুত করে। সমস্যা তখনই হয় যখন মানুষের জায়গায় অমানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আর এজন্য রোহিঙ্গাদের দরকার নেই। আমি এমনিতেই আমাদের দেশে মানুষ থেকে মানুষরূপী জানোয়ারের সংখ্যাই দিন দিন বাড়তে দেখছি, যারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে দিনরাত কামড়াকামড়ি মারামারিতে লিপ্ত। তাই যারা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় বড় কথা বলছেন, তারা জনসংখ্যা কমানোর চেয়ে সত্যিকারের মানুষ বাড়ানোর দিকে একটু মনযোগ দিন। আর সবার আগে আয়নার সামনে গিয়ে দাড়ান। নিজেকে দিয়েই শুরু করুন।