প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছেন এতো সস্তা বিদ্যুৎ নাকি পৃথিবীর আর কোথাও নেই! শুনে হাসবো নাকি কাঁদবো তা বুঝতে পারছি না। আমি নিজে জীবিকার তাগিদে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করি, যেখানে মানুষের বাৎসরিক মাথাপিছু আয় আমাদের দেশের তুলনায় ৫০ গুন বেশি। এখানে আমি হাজার ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটের বিল দেই বাংলাদেশী ১০ টাকার মতো করে (০.১৩ ডলার*)। অথচ বাংলাদেশে আবাসিক খাতে ৪০০ ইউনিটের উপর বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে এখনই প্রতি ইউনিটের বিল দিতে হয় ৭.৮৯ টাকা করে। এবং বুঝাই যাচ্ছে এই রেট ধাপে ধাপে আরও বাড়তে থাকবে, যতোদিন পর্যন্ত না উন্নত দেশগুলোর রেটকে তা অতিক্রম করে। এদিকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী উন্নত দেশের সাথে আমাদের দেশের বিদ্যুতের বিলের পার্থক্যটা উচ্চকন্ঠে হিসাব করলেও বিদ্যুতসেবার অন্যান্য পার্থক্যগুলো নিয়ে কথা বলেননি। যুক্তরাষ্ট্রে গত দুই বছরে আমাদের বাসায় একবার কেবল ১০ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ ছিলো না। তাও কোথাও বিদ্যুতের লাইন মেরামতের জন্য এটা করা হয়েছিলো। এখানে বিদ্যুতপ্রবাহ কোন কারনে সাময়িক বন্ধ রাখা হলে আগে থেকেই এব্যপারে নোটিস দেয়া হয় ভোক্তাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বছরে ১০ মিনিট না, অন্তত দিনে ১ ঘন্টার বেশি লোডশেডিং হবে না, এমনটিও কি সরকার নিশ্চিত করতে পেরেছে? বা অদুর ভবিষ্যতে পারবে বলে মনে হয়? বিদ্যুতসেবার মান কিভাবে আরও বাড়ানো যায় সেটা নিয়ে কি সরকার বা তার অগনতান্ত্রিক উপদেষ্টামন্ডলী অন্যান্য দেশের সাথে আমাদের সার্ভিসের তুলনা করেছে একটিবারের জন্য হলেও? বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানোর আগে বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করতে বাস্তবধর্মী কোন পদক্ষেপ নিয়েছে? বিদ্যুত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে দুর্নীতি বন্ধে সচেষ্ট হয়েছে? বিদ্যুতের অপচয়ের ফুটোগুলো বন্ধ না করে সেই ক্ষতি পোষাতে সবার উপরে অতিরিক্ত অর্থদন্ড দেয়াটা কোন হিসাবে যৌক্তিক?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমন অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ নন, আমি নিজেও নই। তার পরেও আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারি যে আয়ের হিসাব ছাড়া ব্যায়ের হিসাবে সার্বিক চিত্র কখনোই ফুঁটে উঠে না। কারও আয় বেশি থাকলে তার খরচ করার ক্ষমতাও বেশি থাকে। কিন্তু কম আয়ের কারও উপর বেশি ব্যায়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে যদি বলি তোমার চেয়ে দশগুন আয় করে যে লোক, তার চেয়ে তোমার খরচ অর্ধেক কমিয়ে দিলাম, তবে তা শুধু হাস্যকরই না, ক্ষেত্রবিশেষে অন্যায়ও বটে। আমি বলছি না যে না পারতেও বিদ্যুৎ বা অন্যান্য দ্র্যবাদির মূল্য সরকারকে কমাতেই হবে। কিন্তু দাম বাড়িয়ে সেটা নিয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলার কিছু নেই।

নিচে আমি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে মানুষের আয়ের সাপেক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু দ্রব্যের মূল্যের অনুপাতের এক তালিকা দিলাম। এখান থেকে আপনারা যে কেউ একটা ধারণা পাবেন যে আয়ের সাপেক্ষে ব্যয় আমাদের দেশে কতো বেশি।

  বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র    
মাথা পিছু বাৎসরিক আয় - ২০১১ সালের হিসাব অনুযায়ী ৬৬,২৪০ টাকা ৩৩,৩৩,০৪০ টাকা    
মাথা পিছু মাসিক আয় ৫,৫২০ টাকা ২,৭৭,৭৫৩ টাকা    
         
  বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে আয়ের সাপেক্ষে মূল্যের অনুপাত (প্রতি হাজারে)

যুক্তরাষ্ট্রে আয়ের সাপেক্ষে মূল্যের অনুপাত (প্রতি হাজারে)

ভাল মানের চাল - প্রতি কেজি ৪০ টাকা

৮৮ টাকা (১.১ ডলার)

৭.২৪

০.৩১

ডিম - প্রতি ডজন ৯০ টাকা ৯৬ টাকা (১.২ ডলার) ১৬.৩ ০.৩৪
গরুর মাংস - প্রতি কেজি ২৭০ টাকা ৬৬৮ টাকা (৮.৩৫ ডলার) ৪৮.৯ ২.৪০
মুরগীর মাংস - প্রতি কেজি ১৬০ টাকা ২৬৪ টাকা (৩.৩ ডলার) ২৮.৯৮ ০.৯৫
আবাসিক বিদ্যুৎ বিল - প্রতি ইউনিট (১০০০ ইউনিটের উপর হলে) ৭.৮৯ টাকা ১০ টাকা (০.১৩ ডলার) ১.৪২ ০.০৩


দ্রব্যমূল্য এবং ডলার থেকে টাকায় রূপান্তরে একটু এদিক সেদিক হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু তারপরেও আপনারা আয়ের সাপেক্ষে দুই দেশের দ্রব্যমূল্যের তারতম্যের একটা ধারণা পেয়ে যাবেন এখান থেকে।

 


* ডলারের রেট ৮০ টাকা করে ধরা হয়েছে।