আজ রাত ১১ টা ৩০ মিনিটে প্রখ্যাত উপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ মারা গেছেন। ফেসবুক, বিভিন্ন ব্লগিং ওয়েব সাইটে মানুষের শোক প্রকাশ দেখে অবাকই লাগে, এত জনপ্রিয় একজন মানুষ, এত সহজে সারা দেশকে শোকে ভাসিয়ে যায় কি করে?। ব্লগে তার গুণগান গেয়ে তাকে ছোট করার ইচ্ছে ছিল না। আমার আবেগ পরিমানে একটু বেশিই। তাই লেখার খাতায় সামান্য লিখে ছুড়ে ফেলেও তা আবার তুলে নিলাম। বিশ্বাস করুন, লোক দেখানো ভালবাসা না, মনে হচ্ছিল এটুকু না লিখলে খোদার কাছে দায়ী থাকবো।

তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি। সদ্য বইমেলা থেকে বড় আপু "এই সুভ্র! এই!" বইটা কিনে এনেছিল। তখন রোমান্টিকতা, ভালবাসা,আবেগ...... ব্যাপার গুলো মোটামুটি বুঝি। বইটা পড়ে হাসি-কান্না মিলিয়ে এতোটা মোহিত হয়েছিলাম, ঐদিনই বইটা পড়া শেষ। বন্ধুদের কাছে খোঁজ লাগিয়েছি, যার যার বাসায় হুমায়ুন আহমেদের যত বই আছে, সব আমাকে পড়তে দিতে হবে। "কিশোর কণ্ঠ" কে ছুটি দিয়ে সে থেকে আজ পর্যন্ত আমার পড়ার  তালিকায় সব চেয়ে বেশি বই এই লেখকের। 

কোথাও কেউ নেই, বিটিভির ইতিহাসে প্রচারিত সেরা নাটক, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। বাকের ভাইয়ের মৃত্যুতে সবাই মিলে হুমায়ুন আহমেদের বাড়ি ঘেরাও করেছিল। নাটকের একটি চরিত্রের মৃত্যুতে জনগন এতোটা আবেগতারিত হবে, এখন ও বিশ্বাস করা কঠিন। বোধ করি হুমায়ুন আহমেদও সেদিন টের পেয়েছিলেন, এদেশের নাট্যজগতে তিনি হেমেলিনের বাঁশিওয়ালা হয়ে সবাইকে টেনে নিয়ে গেছেন আবেগের স্রোতে। আজ রবিবার  নাটকটি আমাদের পরিবারে ছিল আলিফ লায়লার মতই একটি অনুষ্ঠান। সারা সপ্তাহ অপেক্ষায় থাকতাম, কবে আসবে রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টা । এসব নাটক দেখার সময় হুমায়ুন আহমেদ কে চিনতাম না, চেনার দরকারও মনে করিনি। চেনার তালিকায় ছিল বাকের ভাই(আসাদুজ্জামান নূর), মুনা (সুবর্না মোস্তফা) আনিস (জাহিদ হাসান) । 

হিমু, মিসির আলির কথা সবার মুখে মুখে। সুভ্রর চোখে যে তিনি নিজের অসহায়ত্বকে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তা ও হয়তো ভোলার নয়। এমন চরিত্র সৃষ্টিতে তার জুড়ি নেই। রুপার প্রতি হিমুর ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা দেখে প্রথম প্রথম কষ্ট পেতাম। পরে বুঝতে পেরেছি, সব দূরত্ব কষ্টের না, কিছু দূরত্ব মধুর এবং বজায় রাখা প্রয়োজন। হিমুকে দেখে শিখেছি, একঘেয়েমির জীবনে একটু আধটু বাদর হওয়া দরকার আছে। আছে  অদ্ভূত আচরন করে কাউকে ভড়কে দেয়ার দরকার। সবাই ভালো ভালো ছেলে সেজে থাকলে তাতে ভালোর মর্ম থাকেনা। মিসির আলীর চৌকস বুদ্ধিমত্তা আর লজিক দেখে আমার ও যে মিসির আলী হওয়ার ইচ্ছে জেগেছিল, তা অস্বীকার করি কীভাবে।

এমন একজন মানুষ যে সারা জীবন শুধু মানুষের ভালবাসাই পেয়েছেন, তা না। পেয়েছেন কষ্ট ও। বৃদ্ধকালে নতুন করে সংসার সাজিয়ে সমাজের কাছে হয়েছেন ঘৃণার পাত্র, পরিবার থেকে পেয়েছেন ত্যাজ্যপুত্রের সার্টিফিকেট। অতি পণ্ডিত স্কুল কলেজের বাংলা শিক্ষকরা সুযোগ পেলেই তাকে গালাগালি করে ১৪ গুষ্টি উদ্ধার করেছেন। একজন তরুন নাকি তার বাসায় গিয়ে তার অতি শীঘ্র মৃত্যু কামনা ও করে এসেছে। জবাবে তিনি বলেছিলেন, "  I hope and pray you have a long and meaningful life." 

পুত্র নিষাদ আর নিনিত কে নিয়ে আরও কিছুদিন বাঁচতে চেয়েছিলেন। সেই সাধ তার পূরণ হয়নি। নিউইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ এ বার বার ছাপ পাওয়া গেছে তার মৃত্যু ভয়, আর কিছু দিন বাঁচার ইচ্ছের। কেন জানি উপন্যাসের নায়কের মত নিভৃতেই চলে গেলেন। স্যার, আমরা আপনাকে লেখক হিসেবেই আজীবন পেতে চেয়েছিলাম, কষ্টের গল্পের শেষ উত্তেজনায় মৃত নায়ক হিসেবে নয়। বড় ক্ষতি করে গেলেন, উপন্যাস পড়ার এত উত্তেজনা আর কোনদিন জাগবে না। 

নন্দিত নরক থেকে দেয়াল,

তুমি বেঁচে রবে  মহাকাল।

অজস্র নক্ষত্রের চান্নিপসর রাতে,

দেবনা তোমায় কখনো হারাতে। 

তোমার অপেক্ষায় জেগে জ্যোৎস্না ও জননী,

আসবে কি ফিরে, আগুনের পরশমণি ?

মধ্যাহ্নের মাতাল হাওয়ায়,

তুমি নিঃশ্বাস নেবে শ্যামল ছায়ায়।

বেঁধেছিলে কেন এত ভালবাসার ঋণে ?

তোমায় নিয়েই লিখেছি কাব্য,

শ্রাবণ মেঘের দিনে।