সাম্প্রদায়িকতার উৎস সন্ধানে(একটি দীর্ঘ পরিক্রমা)একাদশ দিনে

একটা বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে ঈশ্বর গুপ্ত,বঙ্কিমচন্দ্রসহ পূর্বোউল্লেখিত কবি-লেখক মুসলিম-বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন যা আজও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে পাই।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই ভেদ-বুদ্ধি? সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধির সঠিক কারণ ইতিহাসই বলে দেবে।এ বিষয়ে  রবীন্দ্র-দৃষ্টি লক্ষণীয়: ভারতবর্ষের অধিবাসীদের দুই মোটা ভাগ,হিন্দু ও মুসলমান।যদি ভাবি,মুসলমানদের অস্বীকার করে একপাশে সরিয়ে দিলেই দেশের সকল মঙ্গল প্রচেষ্টা সফল হবে,তাহলে বড়ই ভুল করব।ছাদের পাঁচটা কড়িকে মানব,বাকি তিনটে কড়িকে মানবই না,এটা বিরক্তিকর কথা হতে পারে,কিন্তু ছাদ রক্ষার পক্ষে সুবুদ্ধির কথা নয়।‌ একই অনুচ্ছেদ থেকে আর একটা উদ্ধৃতি: এক দেশে পাশাপাশি থাকতে হবে,অথচ পরস্পরের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্বন্ধ থাকবে না,হয়তো বা প্রয়োজনের থাকতে পারেসেইখানেই যে ছিদ্রছিদ্র নয়, কলির সিংহদ্বার।দুই প্রতিবেশীর মধ্যে যেখানে এতখানি ব্যবধান সেখানেই আকাশ ভেদ করে ওঠে অমঙ্গলের জয়তোরণ।‌

সাহিত্য-ইতিহাসের পথে ঈশ্বর গুপ্ত,বঙ্কিমচন্দ্র যাঁদের নাম আগেই উল্লেখ করেছি তাঁদের মুসলিম-বিদ্বেষমূলক কবিতা প্রকাশের কারণ কী,তা সাধারণভাবে জানা যায় না।তবে একটা বিষয়ে আমি সুনিশ্চিত যে এইসব কবি-সাহিত্যিকরা সবাই ব্রিটিশ-শাসকদের শোষক না ভেবে ভারতবর্ষে হিন্দুজাতির মুক্তিদাতা ভেবেছিলেন।তাই ব্রিটিশদের জন্য তাঁদের এই কাব্যিক জয়গান!(যাইতোপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে)।আরও একটি বিষয় আলোচ্য হওয়া উচিত,তা হল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যত কবি-লেখক যেন সবাই হিন্দু-ই ছিলেন।মুসলিম কবি-লেখক যেন ছিলেন-ই না।অথবা তাঁদের নাম-ই যেন অস্পৃশ্য অথবা উল্লেখ্য নয়।শাসক বা প্রজা কারও যেন সাহিত্যিক দায়বদ্ধতা ছিল না।সত্যকে চেপে রাখার এ এক বিস্ময়কর অপপ্রয়াস!এ বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। মুসলিম সংযোগের ফলে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি বোধ করি বাংলাতেই হয়েছে।হোসেন শাহেরও আগে রুকনউদ্দিন বারবক শাহ শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের মালাধর বসুকে গুণরাজ খান উপাধি ও বাংলার আদিকবি কৃত্তিবাস ওঝাকে বিপুল সংবর্ধনা দিয়েছিলেন।হোসেন শাহের সেনাপতি পরাগল খানের নির্দেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর প্রথম বাংলা মহাভারত ও ছুটি খানের নির্দেশে শ্রীকর নন্দী দ্বিতীয় বাংলা মহাভারত রচনা করেন;দামোদর,যশোরাজ খান,কবিশেখর প্রভৃতি পদকর্তাগণ ছিলেন হোসেন শাহের আশ্রিত অথবা অনুগৃহীত।প্রকৃতপক্ষে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের যে গৌরব,তার সবটাই সুলতান,আফগান ও মুঘলদের রাজত্বকালে সৃষ্ট।হিন্দু রাজসভায় বাংলাভাষার স্থান ছিল ইতরজনের ভাষা হিসেবে কুন্ঠিত,কিন্তু মুসলিম দরবারগুলোতে যেমন কদর তেমনি খাতির পেয়েছে।স্বাভাবিক কারণেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীরাও এসমযে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন এবং এসব মুসলিম সাহিত্যিকদের মধ্যে বিদ্যাসুন্দর রচয়িতা সাবিরিদ্ খান, জ্ঞানপ্রদীপের কবি সৈয়দ সুলতান,তাঁর শিষ্য মহম্মদ খান,কুতুবনের লেখা মৃগাবতীর অনুবাদকদ্বয় মুহম্মদ খাতের ও করিমুল্লা প্রভৃতির নাম উল্লেখযোগ্য। লক্ষ্যণীয় যে মুসলিম সাহিত্যিকদের অধিকাংশই পূর্ববঙ্গের এবং মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলমান কবিদ্বয়ও পূর্ববঙ্গের(অধুনা বাংলাদেশ)---এই কবি দুজন হলেন দৌলত কাজী ও আলাওল।" (তথ্যসূত্র:সুরজিৎ দাশগুপ্ত-র লেখা 'ভারতবর্ষ ও ইসলাম')....(ক্রমশ:).....................