প্রাথমিক কথাঃ

রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর বিশিষ্ট সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর অপরিসীম ত্যাগ ও কুরবানী এবং দান ও অবদানের কৃতজ্ঞতাবন্ধন থেকে মুসলিম উম্মাহ কিয়ামত পর্যন্ত মুক্ত হতে পারবে না। তিনি সেই স্বল্পসংখ্যক সাহাবার অন্যতম, যাঁরা রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর খেদমতে সর্বক্ষণ হাজির থেকে আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ওহী লিপিবদ্ধ করার দুর্ল্ভ সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেছিলেন। একই সাথে তিনি ইসলামী দুনিয়ার এমন এক মুসলিম ব্যক্তি, যার সুমহান আত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক গুণাবলীর প্রতি চরম উপেক্ষাই শুধু প্রদর্শন করা হয়নি, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস থেকে সেগুলো বিলুপ্ত করার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টাও চালানো হয়েছে। তাঁর পুত পবিত্র চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে এমন সব অপবাদ রটাতেও শত্রুরা দ্বিধাবোধ করেনি, যা সাহাবী মাথায় থাকুন, সে যুগের সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রেও কল্পনা করা সম্ভব নয়।

ইসলামী উম্মাহর মুখোশহীন ও মুখোশধারী শত্রুদের প্রচারণার ধুম্রজালে রাসূল সান্নিধ্যে এ মহান সাহাবীর জান্নাতী চরিত্র আজ আমাদের দৃষ্টিপট থেকে হারিয়ে গেছে সম্পূর্ণরূপে। ফলে আজকের ইসলামী দুনিয়া সিফফীনের যুদ্ধে হযরত আলী ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণকারী মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর কথা তো জানে, কিন্তু জানে না সেই মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর কথা, যিনি ছিলেন রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর পরম প্রিয়পাত্র। ওহী লেখার দায়িত্ব পালন করে শ্রেষ্ঠ নবীর শ্রেষ্ঠ দুআ ও সুসংবাদ লাভ করেছেন তিনি। হযরত উমর ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর মত কঠোর আদর্শবাদী খলীফার মুখেও তিনি যোগ্য নেতৃত্ব ও শাসন দক্ষতার অকুন্ঠ স্বীকৃতি অর্জন করেছেন এবং ইসামের ইতিহাসে প্রথম নৌবহর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশ যিনি রোমকদের বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে কাটিয়েছেন।

মানুষ এ কথা বেশ ভালভাবেই জানে যে, হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর জীবন কেটেছে যুদ্ধ-বিগ্রহে, রক্তপাত ও হানাহানিতে। কিন্তু সাইপ্রাস, রোডেশিয়া ও সুদানের মত গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো যিনি মুসলিম জাহানকে উপহার দিয়েছেন, বহু বছরের বিভেদ রক্তপাতের পর গোটা মুসলিম উম্মাহকে পুনরায় এক পতাকাতলে যিনি ঐক্যবদ্ধ করেছেন; জিহাদের মৃতপ্রায় ফরজ যিনি ফের জিন্দা করেছেন। স্বীয় শাসনকালের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মুকাবেলায় অপূর্ব সাহসিকতা, অপরিসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সহনশীলতা এবং শাসনদক্ষতা ও কর্মকুশলতার বিরল ইতিহাস যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর পূণ্য পরিচয় আজ চাপা পড়ে গেছে প্রচারণার পুরু আস্তরণের নিচে।

হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর জীবন ও চরিত্রের সেই বিস্মৃত অনুপম দিকগুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরাই আমার উদ্দেশ্য। এটা তাঁর বিস্ময়কর, কর্মবহুল ও আদর্শ জীবনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র না হলেও এর মাধ্যমে তাঁর জীবন ও চরিত্রের এমন এক মনোরম ও মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠবে, যা সাধারণ বিবেক বুদ্ধির অনুসারী প্রতিটি মানুষকেই তাঁর প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধায় অভিভূত করে তুলবে।

ইসলাম পূর্ব অবস্থাঃ

তাঁর জন্ম হয়েছিল আরবের অভিজাততম গোত্র কুরাইশের বনু উমাইয়া শাখায়। নেতৃত্ব, বংশ মর্যাদায় বনু হাশিমের ( যে বংশে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম ) পরেই ছিল বনু উমাইয়ার স্থান।

তাঁর পিতা আবু সুফিয়ান ইসলাম পূর্ব জীবনেও ছিলেন অতি উচ্চ সামাজিক মর্যাদার অধিকারী। প্রথম সারির কুরাইশ নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। মক্কা বিজয়ের বরকময় দিনে হযরত আবু সুফিয়ানের ইসলাম গ্রহণে নবী ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ) খুবই প্রীত হয়েছিলেন এবং তাঁর মর্যাদার স্বীকৃতি স্বরূপ ঘোষণা দিয়েছিলেন, আবু সুফিয়ানের ঘরে যে আশ্র্য নিবে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হল।

ইসাম গ্রহণের পর আবু সুফিয়ান বেদনাদগ্ধ হৃদয়ে অনুভব করলেন তার জীবনের বিরাট অংশ হাতছাড়া হয়ে গেছে। তাই তিনি রাসূলের পবিত্র সান্নিধ্যে থেকে শিক্ষা ও দীক্ষার পুর্ণ ফায়দা অর্জনে সচেষ্ট হন। হুনায়ুন যুদ্ধ ছিল রাসূল ৯ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর জীবনের শেষ জিহাদ এবং ইসলামের পক্ষে হযরত আবু সুফিয়ান ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু )-এর প্রথম অস্ত্রধারণ। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর ওফাতের পর ইয়ারমুকের ঐতিহাসিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অবশেষে একত্রিশ হিজরীতে তিনি দুনিয়া থেকে চির বিদায় গ্রহণ করেন।

হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) ছিলেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র। রাসূল ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম )-এর নবুয়্যত লাভের পাঁচ বছর পূর্বে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তাঁর মধ্যে দূর্জয়, সাহস, সর্বজয়ী মনোবল এবং চারিত্রিক আভিজাত্যের আলামত সুষ্পষ্ট হয়ে উঠে। কিশোর মুয়াবিয়াকে লক্ষ্য করে পিতা আবু সুফিয়ান একবার বলেছিলেন, আমার এ ছেলে তার গোত্রে নেতা না হয়েই যায় না।

কিন্তু হযরত আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহা) প্রতিবাদ করে বললেন, শুধু নিজ গোত্রের? সে যদি গোটা আরবের নেতা না হয়, তবে বৃথাই আমার স্তন্যদান। ( আল ইসাবাহ, খ-৩,পৃ-৪১৩)

কৈশোর থেকেই পিতা-মাতা তাঁর শিক্ষা ও দীক্ষার প্রতি পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করেন। ফলে অল্প বয়সেই জ্ঞান ও শিল্পের বিভিন্ন শাখায় তিনি বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠেন। সে সময় মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহ তাআলা আনহু ) ছিলেন মাত্র কয়েকজন লেখাপড়া জানা লোকের মধ্যে অন্যতম। ইসলাম পূর্ব জীবনেও তিনি প্রশংসিত গুণ ও উন্নত নৈতিকতার অধিকারী ছিলেন। আল্লাম ইবনে কাসীর লিখেছেন- স্বগোত্রে তিনি ছিলেন সর্বজন মান্য নেতা এবং অগাধ সম্পদের অধিকারী। ( আল বিদায়া, খ-৮,পৃ-২১ )

ইসলাম গ্রহণঃ

হযরত মুয়াবিয়া ( রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ) মক্কা বিজয়ের দিনে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেও প্রকৃতপক্ষে অনেক আগেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে বেশকিছু অসুবিধার কারনে তিনি তা প্রকাশ করতে অপারগ ছিলেন। ওয়াকিদীর বর্ণনামতে হুদায়বিয়ার সন্ধির পরপরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মক্কা বিজয়ের দিন তা প্রকাশ করেন। এছাড়া ইসলামের তাঁর আকর্ষণ ছিল পূর্ব থেকেই। এ জন্যই আমরা দেখি বদর, অহুদ ও খন্দকের মত গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্তমূলক যুদ্ধ গুলোতে তিনি অনুপস্থিত। অথচ তিনি তখন যুদ্ধ পাগল আরবের এক লড়াকু যুবক। তাঁর সমবয়সী সকলেই প্রতিটি যুদ্ধে উন্মাদনার সাথে শরীক হচ্ছিল। সর্বোপরি সেসব যুদ্ধে পিতা আবু সুফিয়ান কুরাইশদের প্রধান সেনাপতি। তা সত্ত্বেও বদর থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধি পর্যন্ত সকল যুদ্ধে তাঁর দূরে সরে থাকা এ কথাই প্রমাণ করে যে, শুরু থেকেই ইসলামের সত্যতা তাঁর হৃদয়ের মধ্যে স্থান করে নিয়েছিল।

ইনশাল্লাহ পরবর্তী লেখায় ইসলাম গ্রহনের পরবর্তী অবস্থা সম্বন্ধে আলোচনা করা হবে।